যুদ্ধশিশু রানী

মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা জানান, তাঁর বাইপোলার ডিজঅর্ডার হয়েছে। সাত বছর চিকিৎসাধীন থাকার পর ১৯৯৯ সালের ৭ জুন ২৭ বছর বয়সে আত্মহত্যা করেন রানী।

ত্যাগ করেছিলে তুমি আমাকে যখন আমি শিশু,
কেন তা জানি না আমি, কখনো জানব না,
কিন্তু তুমি সারাক্ষণ থাকবে মা আমার ভাবনায়
ভালোবাসবোই জেনো, যেমন কখনও ভালোবাসি।
ছিলাম বিষণ্ন সদা, কেঁদেছি তোমার জন্য কত,
জর্জর ব্যথায় ভরা কত যে রাত্রিতে,
তোমাকে ছোঁবার আগে, জড়িয়ে ধরার আগে
মনে হতো এই ব্যথা কখনো যাবার নয় আর।
(নদীর সন্তান’ – রানী জয় মরাল)

উপরোক্ত কবিতাটি একাত্তরের যুদ্ধশিশু রানী জয় মরাল এর লেখা। আরো ১৪ জন যুদ্ধশিশুর সাথে কানাডায় নেওয়া হয়েছিল যুদ্ধশিশু রানীকেও। মায়ের গর্ভে মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই রানীর জন্ম হয় ১৯৭২ সালের ৩০ মার্চ। পুরান ঢাকায় মাদার তেরেসা পরিচালিত মিশনারিজ অব চ্যারিটির শিশু ভবনে। রানীর জন্মের পরপরই জন্মদাত্রী মা তাঁকে অনাথ আশ্রম কর্তৃপক্ষের হাতে সঁপে দিয়ে আত্মগোপন করেছিলেন। অনাথ আশ্রমের নিয়ম অনুসারে জন্মদাত্রীর নাম-পরিচয় লিপিবদ্ধ হয় না। থাকে কেবল শিশুর জন্মতারিখ আর নাম। অনাথ আশ্রম কর্তৃপক্ষই মেয়েটির নাম দিয়েছিল রানী।

রানীকে দত্তক নেন স্যাসকাট্যুন শহরের ইউনিভার্সিটি অব সাসকাচিওয়ানের অধ্যাপক ড. রবিন মরাল ও বারবারা মরাল দম্পতি। রানী সাসকাচিওয়ান প্রদেশের সাসকাট্যুন শহরে বড় হয়েছে। তিন বছর বয়সেই তাকে সুজুকি বেহালার ক্লাসে ভর্তি করা হয়। ১৯৮৬ সালে তাকে ভর্তি করা হয় বিশপ ম্যাহোনি হাই স্কুলে। তখন সে বেহালার পাশাপাশি বাঁশিও বাজাতে শেখে। সেই বয়সেই সে গান ও কবিতা লিখে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেয়। ১৬ বছর বয়সে রানীর মধ্যে অস্বাভাবিক পরিবর্তন লক্ষ করেন তার দত্তক মা-বাবা, যাঁরা তার কাছে জন্মবৃত্তান্ত গোপন করেননি। রানীর মধ্যে উদাসীন ভাব লক্ষ করেন তাঁরা। সে নিজেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করে। মাঝেমধ্যে অপ্রকৃতিস্থ আচরণ করে। দত্তক মা-বাবার অফুরন্ত আদর-যন্ত্র সত্ত্বেও রানী তাঁর অচেনা জন্মদাত্রীকে চেনার জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়েন। মরাল দম্পতি ভাবেন একবার বাংলাদেশ ঘুরে গেলে হয়তো সব ঠিক হয়ে যাবে।

ছবিঃ ১৯৭২ সালে তৎকালীন পুরান ঢাকার ইসলামপুর রোডে মাদার তেরেসার যুদ্ধশিশু ক্যাম্পে ২১টি যুদ্ধশিশু


আরো চার যুদ্ধশিশুর সঙ্গে রানী বাংলাদেশে আসে ১৯৮৯ সালে। সঙ্গে মরাল দম্পতিও আসেন। রানী দেখতে যায় যেখানে তার জন্ম সেই শিশু ভবন। সে জানতে পারে কোন পরিস্থিতিতে তার জন্ম, কেনই বা তার মা তাকে পরিত্যাগ করেছিলেন, কিভাবে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল কানাডায়। সব জেনে সে স্তম্ভিত হয়ে পড়ে। কখনো না দেখা মায়ের জন্য অশ্রুপাত করতে থাকে।

বাইলিংগুয়াল ডিপ্লোমা নিয়ে গ্র্যাজুয়েট হওয়ার পর রানী ভর্তি হন অন্টেরিওর কিংস্টনের কুইনস বিশ্ববিদ্যালয়ে নার্সিংয়ে। সে সময় তিনি শারীরিক প্রতিবন্ধীদের আশ্রমে সময় ও সেবা প্রদান করেন। কিন্তু দ্বিতীয় বছরই ১৯৯২ সালে তাঁর লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায় অস্বাভাবিক আচরণ আর অসুস্থতার কারণে। রানী উপলব্ধি করতে শুরু করেন জন্মদাত্রী মা তাঁর চারপাশে ঘুরছেন। যে বারবারাকে তাঁর মা হিসেবে জানেন, যাঁর কোলে-পিঠে মানুষ হয়েছেন সেই মা তাঁর পাশে থাকার পরও রানী ভাবতে শুরু করেন তাঁর অতীত নিয়ে। বিষণ্নতা আর একাকিত্ব বাড়তে থাকে। হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিন্তু কোনো চিকিৎসাই কাজে লাগেনি। মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা জানান, তাঁর বাইপোলার ডিজঅর্ডার হয়েছে। সাত বছর চিকিৎসাধীন থাকার পর ১৯৯৯ সালের ৭ জুন ২৭ বছর বয়সে আত্মহত্যা করেন রানী।

ইতিহাসে এদের ঠাই হলো কোথায়?

(লিখেছেন অপরাজিতা নীল)