নোবেল যখন প্রত্যাখ্যাত

0
578

…সসতং কার্য্যং কর্ম্ম সমাচর।

অসক্তো হ্যাচরন্ কর্ম্ম পরমাপ্নোতি পূরুষঃ॥

কৃষ্ণ অর্জুনকে বলছেন, …ফলের আশা ছেড়ে দিয়ে সব সময় কর্তব্য ও কর্ম পালন করে যাও। কারণ, ফলের আশা ছেড়ে কাজ করলে মানুষ মুক্তি লাভ করে। কথাটির গুরুত্ব আমরা সবাই অনুধাবন করি, কিন্তু সে অনুযায়ী চলতে আমরা কজনইবা পারি। বিনা লাভের আশায় কাজ করতে হলে লোভকে নির্বাসনে পাঠানো প্রয়োজন। যা বড়ই জটিল। আবার অনেকের জন্যই সহজ, অনেক উদাহরণ আমরা বিশ্ব ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখতে পাই। লাভ-ক্ষতির হিসেবকে তুচ্ছ করে আজীবন মানবকল্যাণে কাজ করেছেন এমন মনীষীর নামের তালিকাটি সুদীর্ঘ। তবে সেই তালিকায় এমন দুজনের নামও রয়েছে যারা কর্ম ফলের আশা তো করেনইনি, এমনকি নোবেলের মতো লোভনীয় স্বীকৃতিকেও পায়ে ঠেলে দিয়েছেন।

১৯০১ সাল থেকে নোবেল পুরস্কার কমিটি মানবকল্যাণে ব্রতী মনীষীদের পুরস্কৃত করে আসছে। সে বছর থেকে আজ পর্যন্ত কেবল মাত্র দুজনের নাম পাওয়া যায়, যারা স্বেচ্ছায় নোবেল পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছেন! জানা যায়, বার্ট্রান্ড রাসেলও নোবেল নিতে অসম্মতি জানিয়েছিলেন, কিন্তু পরবর্তীতে অনিচ্ছা সত্ত্বেও তিনি তা গ্রহণ করেন।

দার্শনিক জ্যাঁ-পল সার্ত এবং সংগ্রামী রাজনীতিক লে দুক তো- নোবেলের দীর্ঘ ইতিহাসে কেবল এই দুজন মানুষ স্বেচ্ছায় নোবেল পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

ফরাসি দার্শনিক-সাহিত্যিক জ্যাঁ-পল সার্তের অসাধারণ আত্মজীবনীগ্রন্থ Les Mots (ওয়ার্ডস্), ১৯৬৪ সালে এর জন্যই তাকে নোবেলের জন্য মনোনিত করা হয়। কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান। কারণ হিসেবে জানান যে, বর্তমানে নোবেল এমন এক সম্মান যা পাশ্চাত্য লেখক এবং প্রাচ্যের বিপ্লবীদের বাকরুদ্ধ করে দেয়। তিনি আরও বলেন, আলজেরিয়ায় যুদ্ধ চলাকালে তারা ১২১ জনের স্বাক্ষরিত বক্তব্য প্রকাশ করেছিলেন, তখন তাদেরকে পুরস্কার দেয়া হয়নি। দিলে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিকে সম্মানিত করা হয়েছে বলে তারা তা গ্রহণ করতেন। সংগ্রামের শেষে পুরস্কৃত হতে তিনি অপারগতা প্রকাশ করেন।

আধুনিক অস্তিত্ববাদের জনক জ্যাঁ-পল সার্তের জন্ম প্যারিসে, ১৯০৫ (২১ জুন) সালে। ফরাসি ও জার্মান ভাষায় শিক্ষকতা করেছেন। ১৯৩৬ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম দার্শনিকগ্রন্থ L’Imagination (ইমাজিনেশন)। মিত্রবাহিনীর পক্ষে ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যোগ দেন। জার্মানদের হাতে বন্দি হয়ে ১ বছর কারাদন্ড ভোগ করেন। শেষে লেখালেখিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। একের পর এক অনবদ্য উপন্যাস, প্রবন্ধ, ডাইরি ও নাটক রচনা করেন। রাজনীতির সাথে ঘনিষ্ঠ ছিলেন, ১৯৪৯ সালে একটি রাজনৈতিক সংগঠনও গড়ে তোলেন। ১৯৫২ সালে ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত বিশ্বশান্তি সম্মেলনে যোগ দেন। সারাজীবন অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছেন বলিষ্ঠ কণ্ঠে। ১৯৬৬ সালে বার্ট্রান্ড রাসেলের উদ্যোগে গঠিত ‘যুদ্ধাপরাধ আদালত’-এর প্রথম সদস্য হিসেবে সার্ত যোগ দেন। এমনকি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের ওপর পাকিস্তানের বর্বর অত্যাচারের তীব্র নিন্দা জানান তিনি। নসিয়া (১৯৩৮), দি সাইকোলোজি অফ ইমাজিনেশন (১৯৪০), নো এক্সিট (১৯৪৪), দি এজ অফ রিজন (১৯৪৫), দি রিপ্রাইভ (১৯৪৫), ডার্টি হ্যান্ডস (১৯৪৮), আয়রন ই দ্য সোল (১৯৪৯), নেকারসভ (১৯৫৬), লুজার উইন্স (১৯৬০) প্রভৃতি তার বিখ্যাত গ্রন্থ। ১৯৮০ (১৫ এপ্রিল) সালে তিনি মারা যান।

১৯৭৩ সালে ভিয়েতনামের বিপ্লবীনেতা লে দুক তো ও মার্কিন জাতীয় প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জারকে যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রদানে সম্মত হয় নোবেল কমিটি। ১৯৭৩ সালের প্যারিস শান্তি চুক্তি (Paris Peace Accords) ভিয়েতনামে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছে বলে নোবেল কমিটি মনে করে, তাই তারা এই চুক্তির উদ্যোক্তা তো ও কিসিঞ্জারকে নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু লে দুক তো পুরস্কার নিতে অসম্মতি জানান। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ভিয়েতনামে প্রকৃত শান্তি ফিরে আসেনি। যেহেতু শান্তিই প্রতিষ্ঠা হয়নি, সেহেতু তিনি শান্তি প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখার জন্য পুরস্কার গ্রহণ করতে পারেন না। আমেরিকা উত্তর ও দক্ষিণ ভিয়েতনামের মধ্যে যে শান্তি চুক্তি করিয়ে দেয় আসলে তা ছিল একটি মানুষ দেখানো কাজ। কেননা চুক্তির পরও আমেরিকা (প্রেসিডেন্ট নিক্সন এবং পরবর্তিতে প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ড) প্রত্যক্ষ ভাবে দক্ষিণ ভিয়েতনামের বুর্জোয়া প্রেসিডেন্ট নিয়েন ভ্যান থিউকে উত্তরের বিপ্লবীদের দমনে সহযোগিতা অব্যাহত রাখে। ভিয়েতনামের অন্যতম নেত্রীস্থানীয় বিপ্লবী লে দুক তো। হো চি মিনের নেতৃত্বে তো’রা দক্ষিণের বুর্জোয়া শাসন ব্যবস্থাকে হটিয়ে সমাজতান্ত্রিক ভিয়েতনাম প্রতিষ্ঠা করে ১৯৭৬ সালের জুলাইতে।

তো’র জন্ম ১৯১১ সালে (১৪ অক্টোবর) ভিয়েতনামে। ১৯৩০-এর দিকে রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ভিয়েতনামে ফরাসি শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশ নেয়ায় কারা ভোগ (১৯৩০ থেকে ১৯৩৬ এবং ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৪) করেন। ১৯৪৫ সালে হ্যানোই এসে হো চি মিন ও ভো নিয়েন জায়েপের সাথে যোগ দেন, গড়ে তোলেন ভিয়েতনাম বিপ্লবী লীগ (Vietnam Revolutionary League)। ১৯৫৪ পর্যন্ত তো দক্ষিণ ভিয়েতনামের নেতা ছিলেন। যেহেতু তিনি ভিয়েতনাম ওয়ার্কার্স পার্টির সদস্য ছিলেন সেহেতু তাকেই দক্ষিণের বুর্জোয়া শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে হয়। গড়ে তোলেন ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট (এনএলএফ)। এনএলএফ দীর্ঘ সশস্ত্র সংগ্রামের পর ১৯৭৫ সালে দেশি-বিদেশি শত্রুদের পরাজিত করে সমাজতান্ত্রিক ভিয়েতনাম প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৯০ (১৩ অক্টোবর)-এ লে দুক তো মৃত্যুবরণ করেন।