মিশন : হিটলারহত্যা!

0
515

বিশ্বের সবচেয়ে কুখ্যাত মানুষটির নাম হিটলার। বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলার ছিল বিশ্ববাসীর জন্য বিভিষিকা। লক্ষ লক্ষ মানুষ হত্যার সর্বাধিনায়ক তিনি। বিশ্বযুদ্ধের পুরো সময়টা জুড়ে তার নাৎসি বাহিনী নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালায়। এ সময়টাতে হিটলার নিজেও কিন্তু সুখে ছিলেন না। তার ঘরে বাইরে শত্রুর কোনও অভাব ছিল না। তার জন্য সবচেয়ে ভয়ের ছিল তারই আশেপাশে থাকা বন্ধুরূপী শত্রুরা। হিটলারকে কাঁটা বিছানো পথে সবসময় চলতে হতো, অনেক সাবধানতা ও বিচক্ষণতার সাথে ফেলতে হতো প্রতিটি পদক্ষেপ। খুবই বিশ্বস্ত কয়েকজন ছাড়া কাউকে বিশ্বাস করতেন না তিনি। হিটলারের শত্রুরা হিটলারকে একেবারে শেষ করে দেয়ার পরিকল্পপনা করতো। কেননা তারা জানতো, হিটলার যদি কোনও ভাবে বেঁচে যায়, তাহলে তাদের রেহাই নেই। হিটলারের ভয় ছিল, ভয় ছিল বলেই তিনি সবসময় এসএস বাহিনী (হিটলার গঠিত বিশেষ পুলিশ ফোর্স) দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকতেন। এতো কিছুর পরও হিটলারকে মোট ১৭ বার হত্যার চেষ্টা ও পরিকল্পনা করা হয়। তন্মধ্যে, ১৫টি হত্যাপরিকল্পনা বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। আলোচিত ১৫টি হিটলারহত্যা মিশনের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা গুরুত্বের ভিত্তিতে যথাক্রমে তুলে ধরা হলো।

৮ নভেম্বর, ১৯৩৯

মিউনিখের বার্গারব্রাউ বির সেলারে হিটলারের ভাষণ দেয়ার কথা। জোহান গেয়োর্জ এলসার হিটলারকে হত্যার উদ্দেশ্যে ভাষণস্থলে একটি টাইম বোমা রেখে দেন। হিটলার ভাষণ দিতে আসেন রাত ৮:১০-এ। বোমা ফাটার কথা ৯:২০-এ। কিন্তু হিটলার ভাষণ সংক্ষিপ্ত করে ৯:১২-তে সে স্থান ত্যাগ করেন। বোমা যথা সময়েই বিস্ফোরিত হয় এবং মোট ৮ জন মারা যায়। হিটলার বেঁচে যান। পরে এলসার গ্রেফতার হয়। ৯ এপ্রিল, ১৯৪৫ সালে তাকে হত্যা করা হয়। এলসারের স্মরণে জার্মানির একটি রাস্তার নামকরণ করা হয়।

১১ মার্চ, ১৯৪৪

অশ্বসেনা অধ্যক্ষ ব্রেইটেনবুশ হিটলারের ডাকা বৈঠকে অংশ নিতে তার বাড়ি (দি বার্গোফ) যান। সাথে নেন একটি ছোট পিস্তল। তার পরিকল্পনা, হিটলারকে গুলি করার সাথে তিনি নিজেও আত্মহত্যা করবেন। ফিল্ড মার্শাল আর্নস্ট বুশকে অনুসরণ করে তিনি হিটলারের সভাকক্ষের দিকে এগিয়ে যান। কিন্তু সভাকক্ষের দরজার কাছে পৌছালে কর্তব্যরত গার্ড তাকে থামিয়ে দেয়। গার্ড জানায়, জুনিয়র অফিসারদের প্রবেশ নিষেধ। ফলে ব্রেইটেনবুশের পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।

২০ মার্চ, ১৯৪৩

হিটলারের চিফ ইন্টেলিজেন্স জার্টস্ডর্ফ শরীরে বোমা লাগিয়ে হিটলারের কাছাকাছি যান। বোমা ধোকা দিয়ে বসে, বিস্ফোরিত হয় না। ততক্ষণে হিটলারও কাজ শেষে হল থেকে বেরিয়ে যান। তখন জার্টস্ডর্ফ দ্রুত টয়লেটে চলে যান এবং বোমাটিকে কমোডে ফেলে ফ্লাশ করে দেন। এভাবেই আরও একবার বেঁচে যান হিটলার। 

ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৪

পদাতিকসেনা অধ্যক্ষ বুশেই সিদ্ধান্ত নেন, তিনি হিটলারকে মারতে আত্মঘাতি হামলা করবেন; যখন তিনি নিজের হাতে হিটলারকে শীতের নতুন ওভারকোট পরিয়ে দিতে যাবেন তখনই কাজটি বাস্তবায়ন করবেন। এজন্য তার সকল প্রস্তুতিও শেষ। কিন্তু দুর্ভাগ্য, ওভারকোট পরানোর মাত্র একদিন আগে ব্রিটিশ বিমান বাহিনীর হামলায় সকল ওভারকোট নষ্ট হয়ে যায়। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, এর কয়েক সপ্তাহ পর আবারও একই ভাবে হিটলারকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় এবং আবারও ব্রিটিশ বিমান হামলায় ওভারকোটগুলো নষ্ট হয়ে যায়!

১১ জুলাই, ১৯৪৪

পরিকল্পনা অনুযায়ী লেফটেন্যান্ট কর্নেল স্টাফেনবার্গ হিটলারের সাথে বৈঠকে যোগ দিতে হিটলারের বাড়িতে (দি বার্গোফ) যান। স্টাফেনবার্গের সহযোগী ক্যাপ্টেন ফ্রেডরিখ ক্লাউজিং-এর ব্রিফকেসে টাইম বোমা। স্টাফেনবার্গ সভাকক্ষে ঢুকে দেখেন হিটলারের প্রিয়ভাজন গেরিং ও হিমলার অনুপস্থিত। স্টাফেনবার্গদের পরিকল্পনা ছিল তাদেরকেসহ হিটলারকে হত্যা করা। যেহেতু ওই দুজন নেই, সেহেতু সেদিনের মতো পরিকল্পনা স্থগিত করা হয়।

১৫ জুলাই, ১৯৪৪

স্টাফেনবার্গ আবার তার পরিকল্পনা মোতাবেক আগান। এবার স্থান, হিটলারের উল্ফ লেয়ার হেডকোয়াটার। পরিকল্পনা আগের মতোই, স্টাফেনবার্গ বোমাসহ ব্রিফকেসটা মানচিত্র টেবিলের নিচে রেখে বেরিয়ে আসবেন। সময় মতো বিস্ফোরিত হলে, হিটলার ও তার সহযোগীদের বাঁচা অসম্ভব। কিন্তু এবারও পরিকল্পনা স্থগিত করতে হয়, কেননা হিমলার এবারও অনুপস্থিত।

২০ জুলাই, ১৯৪৪

এই তারিখটি ইতিহাসে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। হিটলারের প্রাণনাশের উদ্দেশ্যে যেকটি হামলা হয়েছে, তন্মধ্যে এই দিনের হামলাটি সবচেয়ে ভয়াবহ। হামলার নায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল স্টাফেনবার্গই। উল্ফ লেয়ার হেডকোয়াটারের নিয়মিত মিটিং-এ হিটলারসহ অন্যান্য সবাই উপস্থিত ছিলেন। স্টাফেনবার্গ বোমাভর্তি ব্রিফকেস মানচিত্র টেবিলের নিচে রেখে বাইরে চলে আসেন। অল্পক্ষণ পরই বোমা বিস্ফোরিত হয়। সময়, দুপুর ১২:৪২। কিন্তু, হিটলারহত্যার পরিকল্পনাকারীদের সম্পূর্ণভাবে হতাশ করে সেদিনই সন্ধ্যায় রেডিওতে ঘোষণা ভেসে ওঠে, হিটলার জীবিত! মধ্যরাতে ষড়যন্ত্রকারীদের গ্রেফতার করে ফায়ারিং স্কয়াডের মাধ্যমে হত্যা করা হয়। ৯ এপ্রিল, ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত এই ঘটনায় নাৎসিরা মোট ৯০ জনকে হত্যা করে।

২৭ জুলাই, ১৯৪০

এইদিন হিটলারের সম্মানে প্যারিসে একটি প্যারেডের আয়োজন করা হয়। শিউলেনবার্গ সেই প্যারেডেই হিটলারকে শেষ করে দেয়ার প্রস্তুতি চূড়ান্ত করেন। কিন্তু, হিটলার আকস্মিক ভাবে ২৩ জুলাই প্যারিস সফরে আসেন। তিনি সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত প্যারিসে অবস্থান করেন। এর কয়েকদিন পর শিউলেনবার্গকে চিঠি দিয়ে জানানো হয়, হিটলার ২৭ তারিখের প্যারেড প্রদর্শনী খারিজ করেছেন।

২১ মে, ১৯৪১

এইদিন হিটলারের আরেক দফা প্যারিসে আসার কথা। এবারও আগের মতোই হত্যাপরিকল্পপনা করা হয়। তবে এবারের পরিকল্পনাকারী ফিল্ড মার্শাল উইট্জলেবেন। হত্যাকারীকে হিটলার আবারও হতাশ করেন। শেষ মুহূর্তে জানানো হয়, অনিবার্য কারণবসত হিটলার প্যারিস সফরে আসতে পারছেন না।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কাল, ১৯৩৯

ডেনমার্কের বর্ডারের কাছাকাছি একটি আর্মি ক্যাম্প প্রদর্শনের জন্য হিটলারকে আমন্ত্রণ জানান জেনারেল হ্যামার্স্টেইন। হ্যামার্স্টেইন ও তার অবসরপ্রাপ্ত বন্ধু জেনারেল লাডউইগ হিটলার হত্যার পরিকল্পনা করেন। হিটলার ক্যাম্প পরিদর্শনে এলেই তাকে হত্যা করা হবে, আর সবাইকে বুঝানো হবে হিটলার দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। কিন্তু হিটলার হ্যামার্স্টেইনকে পুরোপুরি নিরাশ করেছেন, তিনি হ্যামার্স্টেইনের নিমন্ত্রণে সাড়া তো দূরের কথা, বরং হ্যামার্স্টেইনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়ে দেন।

বসন্তকাল, ১৯৪৩

ইউক্রেনের পোল্টাভার কাছেই আর্মি গ্রুপ বি, এই রেজিমেন্ট দেখতে আসার কথা ছিল হিটলারের। এই গ্রুপের জেনারেল হিউবার্ট লাঞ্জ, মেজর জেনারেল ড. হান্স স্পায়াডাল এবং কর্নেল স্ট্র্যাক্উইচ এবার হিটলার হত্যার নকশা আঁকেন। হিটলার সফরে এলেই তাকে গ্রেফতার করা হবে। বরাবরের মতো এবারও শেষ মুহূর্তে হিটলার তার মত পরিবর্তন করেন, তিনি আর্মি গ্রুপ বি পরিদর্শনে না এসে অন্য একটি আর্মি ক্যাম্প পরিদর্শনে চলে যান।

১৩ মার্চ, ১৯৪৩

এইদিন হিটলার স্মোল্যান শহরের হেডকোয়াটারগুলো দেখতে আসেন। ক্যাপ্টেন বিসল্যাঞ্জারের পরিকল্পনা ছিল, হিটলার যখন পরিদর্শনে বিমান থেকে নামবেন তখন তার গাড়িকে পাহারা দিয়ে নিয়ে আসবে বিসল্যাঞ্জারের বিশেষ বাহিনী এবং পথেই হিটলারকে হত্যা করা হবে। কিন্তু বিসল্যাঞ্জার বিমান বন্দরে হিটলারকে আনতে গিয়ে দেখেন, হিটলার তার এসএস বাহিনীর ৫০ জন সৈন্য সাথে নিয়ে বিমান থেকে নামছেন। বিসল্যাঞ্জারকে আর গার্ড সরবরাহ করতে হয়নি।

১৩ মার্চ, ১৯৪৩

একই দিন কর্নেল ট্রিস্কাও আরেকটি পরিকল্পনা করে রেখেছিলেন। কথা ছিল, হিটলার যখন সবাইকে নিয়ে লাঞ্চ করবেন তখন ট্রিস্কাও উঠে দাঁড়াবেন, এটাই হবে সংকেত। সংকেত পাওয়ার সাথে সাথে ট্রিস্কাও-এর দলের অন্যান্যরা ‘ওপেন ফায়ার’ করবে হিটলারকে লক্ষ্য করে। কিন্তু লাঞ্চের সময় এসএস বাহিনী হিটলারকে এমন ভাবে ঘিরে রেখেছিল যে, ট্রিস্কাও সাহস করতে পারেননি।

১৩ মার্চ, ১৯৪৩

পরিদর্শন শেষে হিটলার বার্লিনের উদ্দেশ্যে বিমানে চড়েন। এইদিন হিটলার হত্যার শেষ চেষ্টাটি করেন লেফটেন্যান্ট ফ্যাবিয়ান শ্লাব্রেন্ড্রফ। পরিকল্পনার নির্দেশক কর্নেল ট্রিস্কাও। শ্লাব্রেন্ড্রফ কর্নেল হেইঞ্জ ব্রান্টকে ২টি ব্রান্ডির বোতল দিয়ে বলেন, বোতল দুটি যেন বার্লিনের মেজর জেনারেল হেলমুথ স্টাইফের কাছে পৌছে দেয়া হয়। শ্লাব্রেন্ড্রফরা জানতেন হেইঞ্জ ব্রান্ট বিমানে হিটলারের ঠিক পেছনে বসবেন। মদের বোতলে ছিল টাইম বোমা। হিটলারকে নিয়ে বিমান আকাশে উড়তেই বোমা বিস্ফোরণ হবে। কিন্তু শ্লাব্রেন্ড্রফরা অবাক হয়ে শুনলেন, হিটলার বার্লিন পৌছেছেন! তার মানে বোমা বিস্ফোরিত হয়নি! শ্লাব্রেন্ড্রফ তৎক্ষণাৎ বার্লিনে পৌছান; কর্নেল ব্রান্টের কাছ থেকে বোতলদুটি ফেরত নিয়ে আসল মদের বোতলের সাথে বদলিয়ে দিয়ে হাফ ছেড়ে বাঁচেন।

ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৫

হিটলার হত্যার শেষ পরিকল্পনাটি করেন তারই প্রতিরক্ষা মন্ত্রী এলবার্ট স্পির। তিনি ভাবলেন, হিটলারের বাঙ্কারে যদি গোপনে বিষাক্ত টাবান গ্যাস (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানিতে উৎপাদিত) ছেড়ে দেয়া যায় তাহলে হিটলারের মৃত্যু অনিবার্য। তিনি তার পরিকল্পনার কথা জানান, অস্ত্রশস্ত্র উৎপাদন বিষয়ক প্রধান ডায়েটার স্টালকে। কিন্তু স্টাল জানেন, টাবান গ্যাস তখনি কাজ করবে যখন তা বিস্ফারিত হবে। বিস্ফোরণ করতে হবে না এমন গ্যাস হয়তো পাওয়া যেতো, কিন্তু তার আগেই হঠাৎ করে বাঙ্কারের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়, মোতায়েন করা হয় আগের চেয়ে আরও বেশি এসএস পুলিশ। ফলে স্পিরের পরিকল্পনা আলোর মুখ দেখতে পায়নি।