ন্যুড ফটোগ্রাফি ও ফটোগ্রাফার

0
1453

নৃবিজ্ঞান বলে, মানুষ প্রাকৃতির নিয়ম অনুযায়ী নিরাভরণ ছিল। এক সময় মানুষ বৃষ্টি-বাদল, রৌদ্র ও শীত থেকে বাঁচতে বিভিন্ন উপাদান দিয়ে শরীর ঢাকা শুরু করে। তখন অন্তত লজ্জা বা শরমের তাগিদে মানুষ দেহ ঢাকতো না। মূল কথা, প্রাকৃতিক ভাবেই মানুষ নিরাভরণ।

ন্যুড আর ইরোটিক শব্দ দুটির মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। ন্যুড শব্দের অর্থ নিরাভরণ বা নগ্ন, ইরোটিক শব্দের অর্থ কামদ, এটি যৌনতার সাথে সম্পৃক্ত। মানুষের কামদ প্রবৃত্তিকে আন্দোলিত করা ন্যুড ফটোগ্রাফি আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল না। ন্যুড ফটোগ্রাফি মানব দেহকে শিল্পখণ্ড বলে মনে করে। সেই শিল্পখণ্ডকে শৈল্পিক ভাবে তুলে ধরতেই ন্যুড ফটোগ্রাফির জন্ম। এক সময় আর্টের বিষয় হিসাবে মানবদেহকে ব্যবহার করতো চিত্রকলা, এখন করে আলোকচিত্রকলা। যৌনতাকে বাহবা দিতে কিংবা প্রসার বাড়াতে ন্যুড ফটোগ্রাফি কাজ করে না। যৌনতা বা কামকে প্রাধান্য দিলে সেটা আর আর্টের পর্যায়ে থাকে না, সেটা হয়ে যায় স্বতঃস্ফূর্ততাহীন ও উদ্দেশ্যমূলক বস্তু। ন্যুড আর্ট বলতে চায়, নগ্নতা মানেই অশ্লীলতা না। এটা একটি বিতর্কিত বিষয়। আমরা বিতর্কে লিপ্ত না হয়ে ন্যুড ফটোগ্রাফির ইতিহাসের কিছু অংশে আলোকপাত করব।

ন্যুড ফটোগ্রাফি যতই বিতর্কিত হোক না কেন, এর প্রারম্ভটা কিন্তু নিঃসন্দেহে দুঃসাহসিক ছিল। ১৮৩৫ সালের আগে ন্যুড আর্ট বিভাগটি ছিল চিত্রকলার অংশ। ড্যাগুয়্যারটাইপ ক্যামেরা আবিষ্কারের পরই ন্যুড ফটোগ্রাফির যাত্রা শুরু হয়। গোড়ার দিকেই ন্যুড ফটোগ্রাফি সমাজের ওপর তলার শিল্প-সমঝদার শ্রেণীর কাছে জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে। সেটা ১৮৩৮ সালের কথা।

ফরাসি ফটোগ্রাফার ফিলিক্স জাক্স মালান ১৮৪৯ সালে ফ্রান্সেই ছবির দোকান খোলেন। তিনি ন্যুড ফটোগ্রাফ তুলে তা বিক্রি করতেন। ন্যুড ফটোগ্রাফির তিনি প্রধান পথপ্রদর্শক। মালানকে ন্যুড ফটোগ্রাফির জন্য জেলও খাটতে হয়েছে। তার বিখ্যাত ন্যুড ফটোগ্রাফগুলো তার L’Algérie photographiée নামে প্রকাশিত হয়। এই বিখ্যাত ফটোগ্রাফারের জীবনকাল ১৮০২-১৮৭৫ সাল।

ন্যুড ফটোগ্রাফির স্বর্ণযুগের সূত্রপত বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে। এই শতাব্দীর অন্যতম পুরোধা এডওয়ার্ড ওয়েস্টন । জীবনকাল : ১৮৮৬-১৯৫৮ সাল। ফটোগ্রাফিতে ক্যারিয়ার গড়তে ১৯০৬ সাল থেকে তিনি ক্যালিফোর্নিয়ায় বসবাস শুরু করেন। তিনি ন্যুড ফটোগ্রাফিকে বিশেষ এক মাত্রা দেন। তিনি ন্যুড ফটোগ্রাফিতে নতুন ও অভিনব পদ্ধতি সংযোজন করেন। তিনি ১৯৩২ সালে গঠিত বিখ্যাত এফ/৬৪ ফটোগ্রাফি গ্রুপের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা।


ন্যুড ফটোগ্রাফি আন্দোলনে নারী ফটোগ্রাফারদের অবদান কম নয়। প্রধান ভূমিকা পালন করেন রুথ বার্নহার্ড । জন্ম ১৯০৫ সালে। তিনি যখন ফটোগ্রাফিতে আসেন তখন তার বয়স ২৪। ১৯২৭-এ ক্যারিয়ার গড়তে চলে আসেন নিউ ইয়র্কে। তাকে ন্যুড ফটোগ্রাফির মহান শিল্পী বলে আখ্যায়িত করা হয়। তিনি ন্যুড ফটোগ্রাফিতে মনোযোগী হন ১৯২০ সালে থেকে। তার তোলা বিখ্যাত ন্যুডগুলো The Eternal Body: A Collection of Fifty Nudes গ্রন্থে স্থান পেয়েছে। তার মৃত্যু হয় ২০০৬ সালে।

শিল্পী ই. জে. ব্যালক বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে পতিতাদের নিরাভরণ ছবি তুলে বিখ্যাত হয়ে আছেন। তার ছবিগুলোতে পতিতাদের জীবন ও বিষন্নতা ফুটে ওঠে। ব্যালককে বিংশ শতাব্দীর প্রথম ন্যুড ফটোগ্রাফার হিসেবে অনেকে মনে করেন। জীবনকাল : ১৮৭৩-১৯৪৯ সাল।

জুলিয়ান ম্যান্ডেলও তার বিবস্ত্র নারীর ছবিগুলোর জন্য ১৯২০ ও ১৯৩০-এর দিকে বিখ্যাত হয়ে ওঠেন। তিনি আউটডোর ন্যুড ফটোগ্রাফির পক্ষে ছিলেন। ম্যান্ডেল এতোটাই বিখ্যাত ছিলেন যে, তার নামে আমেরিকার Johns Hopkins University একটি স্কলারশিপের নামকরণ করে। এই ফটোগ্রাফারের জন্ম ১৮৭২ সালে, মৃত্যু ১৯৩৫-এ।

অ্যারান্ডেল হোম্স নিকোল্স বিংশ শতাব্দীর প্রথম দুই দশকের আরেক প্রধান ন্যুড ফটোগ্রাফার। তার শিল্পকর্মগুলোকে আমেরিকার বিশ্বখ্যাত কিনসি ইন্স্টিটিউটের আর্কাইভে স্থান দেয়া হয়। তিনিও ম্যান্ডেলের দেখানো পথ অনুসরণ করে ন্যুড ফটোগ্রাফিকে স্টুডিওর বাইরে নিয়ে আসতে সচেষ্ট ছিলেন। এছাড়া অন্যান্য বিখ্যাত ন্যুড ফটোগ্রাফারদের মধ্যে Louis-Am d e Mante (1826 – 1913), Gaudenzio Marconi (1841-1885), Wilhelm von Gloeden (1856-1931), Paul Nada (1856 – 1939), Stanislaus Julian Walery (1860- 1955), Emile Reutlinger (1863-?), Ernst Heinrich Landrock (1878-1966), Rudolf Franz Lehnert (1878-1948), Vincenzo Galdi (1880-1910), Imogen Cunningham (1883-1976), Walter Bird (1903-1969), Zoltán Glass (1903-1982), John Everard (1906-1999), Horace Roye (1906-2002), Helmut Newton (1920), Harrison Marks (1926-1997), Bettina Rheims (1952) -এর নাম বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য।