জলবায়ু পরিবর্তন : সমুদ্র হলো খেলার মাঠ

0
967

জলবায়ু পরিবর্তন আজ বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সর্বব্যাপী আলোচনার বিষয়বস্তু। বিশ্ববাসীর জন্য এ এক বিরাট চ্যালেঞ্জ।  জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের চরম উদাহরণ একটি পুরো সমুদ্র শুকিয়ে যাওয়া। এমনই এক শুকিয়ে যাওয়া সমুদ্র অ্যারাল (Aral)।

অ্যারাল ছিল একটি অন্তর্সমুদ্র । কেননা এর চারপাশটা কাজখস্তান ও উজবেকিস্তানের ভূখন্ডে ঘেরা। এটিকে লবাণাক্ত হ্রদ বলেও অনেকে চিহ্নিত করেন। ১৯৬০ সালেও এটি ছিল পৃথিবীর ৪র্থ বৃহৎ অন্তর্সমুদ্র। এর আয়তন ছিল ২৬ হাজার ২শ ৫০ বর্গমাইল। ৪০ বছর আগেও উজবেকিস্তানের মুইনাক ছিল সবচেয়ে ব্যস্ততম বন্দর, আজ সেখানে প্রাণের কোনও স্পন্দন নেই। আজ সেখানে কোনও জাহাজের জেটি নেই, নেই কর্মব্যস্ততা, যতদূর চোখ যায়- বালি আর লবণের ধুধু মরুভূমি। সমুদ্র এখন বাচ্চাদের খেলার মাঠ।

কাজখস্তান ও উজবেকিস্তান আগে সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্গত ছিল। দেশ দুটি স্বাধীনতা লাভ করে ১৯৯১ সালে। তার আগে ১৯৬০-এর দিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন তুলা ও ধান চাষের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের সিদ্ধান্ত নেয়। তা বাস্তবায়নে সরকার এ অঞ্চলের আমাদরিয়া ও সিরদরিয়া নামের নদী দুটির গতিপথে বেশ কিছু বাঁধ তৈরি করে। এই আত্মঘাতী উদ্যোগের ৩০ বছরের মধ্যে নেমে আসে ভয়াবহ মানববিপর্যয়। নদীর গতিপথ বাধাগ্রস্থ হওয়াই অ্যারালের মৃত্যুর প্রধান কারণ। নদীর পানি না পাওয়ায় অ্যারাল সাগর শুকাতে শুরু করে; ২০১০ সাল নাগাদ এর ৯০ শতাংশ শুকিয়ে যায়, ফলে স্থলভাগে লবণের পরিমাণ বাড়ে। লবণের কারণে একদিকে গাছপালা ও ফসল নষ্ট হয়ে যায়, অন্যদিকে জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীকূলের মৃত্যু ঘটে। মৎসশিল্প সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় বেকার সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করে। শুধু তাই নয়, সেখানে তীব্র পানি সঙ্কট দেখা দেয়। যতটুকু পানি পাওয়া যায় তার পুরোটাই তুলার সার, কীটনাশক ও লবণে দূষিত। গবেষকরা বলেছেন, মুইনাক ও তার আশপাশের এলাকায় ক্যান্সার, ফুসফুসজনিত রোগ ও অকাল মৃত্যু আগের চেয়ে ৩০ গুণ বেড়ে গেছে। মুইনাক এখন একটি মরুভূমির শহর, সমুদ্রস্থল থেকে ১শ কিলোমিটার পর্যন্ত মরুভূমি বিস্তৃত। এখানেই শেষ নয়, গবেষণা বলেছে, এই শুকিয়ে যাওয়া সমুদ্র থেকে প্রতি বছর ৭শ ৫০ লাখ টন বিষাক্ত ধুলিকণা ও লবণ বাতাসে উড়ে মধ্য এশিয়া অঞ্চলে চলে আসে। আরও বলা হয়েছে, অ্যারাল পুরোপুরি শুকিয়ে গেলে প্রায় ১৫শ কোটি টন লবণ পড়ে থাকবে যা পুরো পৃথিবীর জন্যই হুমকি স্বরূপ।

ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর দি অ্যারাল সি প্রোগ্রাম-এর রিম আবদুলোভিচ জিনিয়াটোলিন আশা করেন, অ্যারাল সাগরের ট্রেজেডি থেকে পৃথিবীর অন্যান্য দেশ শিক্ষা গ্রহণ করবে। মুইনাকের ডেপুটি-মেয়র তোগিয়ান ইব্রাজিমোভা বলেছেন, এ অঞ্চলে কি ধরণের কৃষিপদ্ধতি চালু করা উচিত তা নিয়ে কেউ বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবেনি, আর ভাবেনি বলেই ভবিষ্যতেও এমন বিপর্যয়ের আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। ৪ এপ্রিল, ২০১০ জাতি সংঘের মহাসচিব বান কি মুন মুমূর্ষু অ্যারাল সাগর দেখে বিস্মিত হন, একে তিনি ‘বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর প্রাকৃতিক বিপর্যয়’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। এই বিপর্যয় ঠেকাতে তিনি মধ্য এশিয়ার নেতাদের প্রতি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানিয়েছেন।

আশার কথা হলো, এ অঞ্চলের কৃষিপদ্ধতিতে পরিবর্তন আনলে সমুদ্রে যতটুকু পানি (১০%) অশিষ্ট আছে ততটুকু সংরক্ষণ করা সম্ভব এবং চাইলে অ্যারাল সাগরকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যাবে। এর জন্য প্রয়োজন মধ্য এশিয়ার নেতাদের সদিচ্ছ ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.