কানাডার মন্ট্রিয়লে লালন সেন্টার

0
1093

মন্ট্রিয়লে বিশ্বখ্যাত ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের মিলনায়তনে গত শুক্রবার এক অনাড়ম্বর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে যাত্রা শুরু হল লালন সেন্টারের। লালন শাহ্‌/লালন সাঁই/লালন ফকির নামে পরিচিত অষ্টাদশ শতকের এই বাঙালী দার্শনিক, বাউল সঙ্গীত রচয়িতা, সমাজ সংস্কারক, চিন্তাবিধ ১৭৭২ সাল থেকে ১৮৯০ সাল পর্যন্ত ১১৮ বছরের দীর্ঘ জীবনে জাত-পাত আর ধর্ম নির্বিশেষে মানুষ আর মানবতার জয়গান করে গেছেন। এক তীর্থযাত্রায় গুটি বসন্তে আক্রান্ত হলে, সহযাত্রীগণ কর্তৃক কালিগঙ্গা নদীর তীরে পরিত্যাক্ত হন। মলম শাহ্‌ আর মতিজান বিবির আশ্রয়ে সুস্থ হয়ে উঠেন অসুস্থ লালন এবং পরবর্তীতে মলম শাহ্‌ আর মতিজান বিবি প্রদত্ত জমিতে আঁকড়া বানিয়ে স্থিত হন। কুষ্টিয়া জেলায় লালনের আঁকড়াটি ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জোড়াসাকোর ঠাকুর পরিবারের জমিদারী এলাকার অন্তর্ভুক্ত। সিরাজ সাঁইের দর্শনে অনুপ্রাণিত হয়ে মানবতাবাদী দর্শনের পথে বাঙালীর শিল্প সংস্কৃতি আর মননে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেন লালন সাঁইের দর্শন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল সহ দেশী বিদেশী অসংখ্য শিল্প সাহিত্যিককে অনুপ্রাণিত করেছে লালনের দর্শন। ধারণা করা হয় লালন শাহ্‌ কয়েক হাজার গান কম্পোজ করে গেছেন। বাউল গুরু লালন শাহ্‌ এবং তাঁর সাথীদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অভাবে মুখে মুখে ধারণ করা অসংখ্য গান হারিয়ে যায় এবং স্বীকৃত হয়েছে মাত্র ৮০০টি।
কানাডাকে বলা হয় উদার মাল্টিকালচারালিজমের তীর্থভূমি। কেবল মন্ট্রিয়ল শহরই আগলে রেখেছে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর শতাধিক সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে। জাতি, গোত্র, ধর্ম নির্বিশেষে মানুষের চূড়ান্ত পরিচয় কেবলই মানুষ। জাতি, গোত্র, ধর্ম আর বর্ণের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইজনিত উগ্রতায় আজ কলুষিত মানবসভ্যতা। এই কলুষিত সমাজকে মানবিকতা আর মনুষ্যত্বের স্স্নিগ্ধতার উদ্ভাসিত করবার প্রয়াসে লালনের দর্শনকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরবার জন্যে মন্ট্রিয়লে লালন সেন্টারের যাত্রা শুরু। এই সেন্টারের সভাপতির হচ্ছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব) দিদার আতাউর হোসেইন আর সাধারণ সম্পাদক জননন্দিত সঙ্গীত শিল্পী মাহমুদুজ্জামান বাবু। বিভিন্ন জাতিগত আর ভাষাগত কমিউনিটির মাঝে মানুষের আর সংস্কৃতির সেতুবন্ধন রচনা লালন সেন্টারের প্রধান লক্ষ্য। বিশ্বসংস্কৃতির অন্যতম পাদপীঠ মন্ট্রিয়লের বহুধারার সংস্কৃতির আন্তর্জাতিক মোহনায় সাংস্কৃতিক উৎসব, প্যারেড, সেমিনার, বইমেলা ইত্যাদির আয়োজন, শিশু আর যুবকদের জন্যে প্রশিক্ষণ, ওয়ার্কশপ, আর বিশ্ববিদ্যালয়/গবেষণা প্রতিষ্ঠান/জাদুঘর কিংবা শিল্প সংস্কৃতি আর শিল্পকলার সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যমে মানুষ, মনুষ্যত্ব আর মানবতার জন্যে কাজ করে যাবার প্রত্যয়ে দৃঢ়চিত্তে এগিয়ে যাবার জন্যে অঙ্গীকারাবদ্ধ এই লালন সেন্টার।
শ’ খানেক মাল্টিকালচারাল দর্শকের উপস্থিতিতে মন্ট্রিয়ল মেট্রোপলিটনের সদ্য সাবেক ডেপুটি মেয়র মেরি ডেরস উদ্বোধন করেন লালন সেন্টারের। বহুভাষাবিদ গ্রীক কানাডিয়ান জেনিফার ডাভোস বিশেষ অতিথি হিসেবে চমৎকার বাংলায় শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন। মাহমুদুজ্জামান বাবু আর অনুজা দত্ত কয়েকটি লালনগীতি পরিবেশন করেন। গানের মর্মবাণীগুলো বাংলা, ইংরেজী আর ফরাসী ভাষায় উপস্থাপন করেন মাহমুদুজ্জামান বাবু, সারা জেসমিন আর ডাঃ জিনাত ফারাহ নাজ। সঞ্চালনায় ছিলেন ম্যাকগিলে গবেষণারত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের শিক্ষিকা রোকেয়া চৌধুরী।সার্বিক সহযোগিতায় ছিলেন ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের পোস্টগ্রাজুয়েট, আন্ডারগ্রাজুয়েট বাংলাদেশী স্টুডেন্ট সোসাইটি। সবশেষে ধন্যবাদ জানিয়ে বক্তব্য রাখেন বাংলা একাডেমী পুরস্কারপ্রাপ্ত মুক্তিযুদ্ধের গবেষক তাজুল মোহাম্মদ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.