দুই সৌদি জল্লাদের জবানবন্দি

0
1461

মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা নিয়ে তেমন আপত্তি না থাকলেও সবাই সৌদি সরকারের প্রকাশ্যে শিরশ্ছেদের মতো আইনী নীতির সমালোচনা করছে। এই আইনের বাস্তবায়ন যারা করেন তাদের ভাবনা কি তা জানতে গণমাধ্যমগুলো চেষ্টা চালালেও সফলতা তেমন পাওয়া যায়নি। সৌদি জল্লাদরা সব সময়ই আড়ালে থাকেন, মিডিয়াকে এড়িয়ে চলেন। কয়েকটি গণমাধ্যম তাদের কয়েক জনের সাক্ষাৎকার নেয়ার সুযোগ পেয়েছিল। তেমন দুজন সৌদি জল্লাদের দুর্লভ সাক্ষাৎকার সংগ্রহ এবং তার ভাবানুবাদ তুলে ধরা হলো।

মধ্যপ্রাচ্যের সংবাদভিত্তিক ‘মিডল ইস্ট মিডিয়া রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এমইএমআরআই) টিভি’র বরাত দিয়ে ২০০৯ সালের ১৭ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের ‘রাইট সাইড নিউজ’ পত্রিকা সৌদি জল্লাদ আবদাল্লাহ আল-বিশির এই সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করে।

প্রশ্ন : শিরশ্ছেদ করতে গিয়ে কখনো কি দন্ডদেশ প্রাপ্তের প্রতি আপনার দয়া জাগেনি?

আব্দাল্লাহ আল-বিশি : আমি যার শিরশ্ছেদ করার জন্য নিয়োজিত তার প্রতি আমি দয়া দেখাতে পারি না, দয়া দেখাতে গেলে আমি এক কোপে তার ধরটি শরীর থেকে আলাদা করতে পারবো না, আর না পারলে দণ্ডাদেশ প্রাপ্ত ব্যক্তির আরো বেশি কষ্ট হবে।

প্রশ্ন : আপনার শুরুর দিকের কথা জানতে চাই…

আল-বিশি : এই পেশা আমি পরম্পরায় পেয়েছি, আমার বাবার মৃত্যুর পর আমি এ দায়িত্ব পাই। বাবা যখন শিরশ্ছেদ করতেন তখন আমি তার সঙ্গে থাকতাম। যখন নিজের প্রথম কাজটি করতে গেলাম তখন দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হয়ে ছিলাম। মনে হচ্ছিল আমি ঠিকঠাকভাবে কাজটি করতে পারবো না। আমার ভয় ছিল, যদি এক কোপে ধর শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করতে না পারি তাহলে মানুষ আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করবে।

প্রশ্ন : এ ধরনের কাজের জন্য কি কোনো শিক্ষার প্রয়োজন হয়?

আল-বিশি : প্রত্যেক জল্লাদকে অবশ্যই তার ক্ষেত্রের ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জন করতে হয়। তাকে জানতে হবে দন্ডাদেশ প্রাপ্ত ব্যক্তির কোন দিকে দাঁড়াতে হয়, বাতাস কোন দিকে প্রবাহিত হচ্ছে এবং সেই বাতাসকে কিভাবে কাজে লাগাতে হয়। বাকিটা সহজ। জল্লাদকে আবেগ তাড়িত হলে চলবে না, আবেগে হাত কাঁপবে। আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে শিরশ্ছেদ করতে দুই, তিন, চার এমনকি পাঁচ কোপও লাগাতে পারে। এরপরও নাও মরতে পারে; তাই আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা খুবই জরুরি। নিয়ন্ত্রণহীন আবেগ আপনার হাত দুটোকে ঠিক মতো কাজ করতে দেবে না। আপনার হাত আপনার সঙ্গে প্রতারণা করে বসবে। এই কাজটি করতে শরীরের জোরের চেয়ে মনোযোগ বেশি প্রয়োজন।

প্রশ্ন : আপনার পেশা কি আপনার জীবনে কোনো প্রভাব ফেলে?

আল-বিশি : যখন কাজটি সফলভাবে শেষ হয় তখন অনেক স্বস্তি বোধ করি। কাজ শেষে নিশ্চিন্ত মনে বাড়ি ফিরে সন্তানের সঙ্গে খেলি, অনেক মজা করি, দুপুরে একসঙ্গে খাই। অনেক সময় বাইরেও বেড়াতে যাই। যখন কাজ থাকে না তখন জীবনটা আরো সাধারণ, বেশিরভাগ সময় বাসাতেই থাকি, আমার কাজ আমার জীবনে কোনো প্রভাব ফেলে না।

প্রশ্ন : আপনার পরিবারের প্রতিক্রিয়া কি?

আল-বিশি : একটা ঘটনা বললে বুঝাতে পারবেন। একবার আমি আমার ছেলে মুহাম্মাদকে সঙ্গে করে নিয়ে গেলাম। সেদিন এক চোরের হাত কাটার কথা ছিল। হাত কাটা শেষে আমরা ফিরে এলাম। মুহাম্মাদ যখন স্কুলে গেলো তখন তার বন্ধুরা তাকে ঘিরে ধরে। কি হয়েছিল তারা জানতে চায়। কিভাবে একজন চোরের হাত কাটা হয় মুহাম্মাদ তা বর্ণনা করে। একদিন স্কুলের প্রিন্সিপাল আমাকে ডেকে ধন্যবাদ দিলেন। তিনি বললেন, যে মুহাম্মাদের মাধ্যমে শিক্ষর্থীরা চমৎকারভাবে জানতে পারলো যে চোরের পরিণত কি হয়।

প্রশ্ন : শিরশ্ছেদ করার জন্য আপনারা নিশ্চয় বিশেষ তলোয়ার ব্যবহার করেন…

আল-বিশি : প্রধানত যে তলোয়ার দিয়ে শিরশ্ছেদ করা হয় তার নাম ‘জওহর’। জওহর আবার দুই ধরনের-ভারতীয় ও মিসরীয়। তন্মধ্যে ভারতীয় জওহরই সেরা। আমি যেটা ব্যবহার করি তার নাম ‘সুলতান’। এটি আমার সবচেয়ে প্রিয়, কেননা প্রশিক্ষণ শেষে এটি দিয়েই আমি প্রথম শিরশ্ছেদ করি। মাশাল্লাহ্, এটি একটি অসাধরণ তলোয়ার। আমার কাছে একটি ভারতীয় জওহরও রয়েছে। মাশাল্লাহ্, এটি দিয়ে একই সময়ে দশটি মাথা কাটা সম্ভব, কিন্তু তলোয়ারের কিচ্ছু হবে না। আমার আরো একটি জওহর আছে। খুব উন্নতমানের না হলেও, খারাপ না।


মুহাম্মাদ সাদ আল-বিশি সৌদি আরবের প্রধান জল্লাদ হিসেবে পরিচিত। শিরশ্ছেদ ও গুলি করে মৃত্যুদন্ড কার্যকর এবং হাত কাটার অভিজ্ঞতা রয়েছে। ২০০৩ সালের জুনে তার একটি দুর্লভ সাক্ষাৎকার নিয়েছিল ‘ডেলি আরব নিউজ’ পত্রিকা। একই বছরের ৫ জুন সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করা হয়। ‘বিবিসি নিউজ’ও একই দিন সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করে।

প্রশ্ন : দিনে কত জনের শিরশ্ছেদ করতে হয়?

সাদ আল-বিশি : কখনো দিনে দুটি, কখনো চার, কোনো দিন দশ। কতজনের শিরশ্ছেদ করতে হবে তা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমি শুধু আল্লাহ্র ইচ্ছে পূরণ করে থাকি।

প্রশ্ন : আপনার শুরুটা কেমন ছিল বলবেন?

সাদ আল-বিশি : পারিবারিক ঐতিহ্যের কারণে আমি জল্লাদ পেশা বেছে নিই। ১৯৯৮ সালে জেদ্দায় প্রথম কাজটি করি। আমার সামনে একজন অপরাধী হাঁটুগেড়ে বসেছিল, আমি এক কোপে তার মাথাটি তার শরীর থেকে আলাদা করি। মাথাটি গড়িয়ে অনেক দূর পর্যন্ত চলে যায়। আমি অবশ্যই তখন নার্ভাস ছিলাম, কেননা অসংখ্য মানুষ আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। এখন অবশ্য সেদিন আর নেই।
আমি এই কাজে যোগ দিয়েছি কারণ আমি মনে করি, এটি আল্লাহ্র কাজ। অনেকে শিরশ্ছেদ করা দেখতে এসে অজ্ঞান হয়ে যায়। আমি বুঝি না যারা এসব সহ্য করতে পারে না তারা কেন আসে।

প্রশ্ন : আপনার কি এসব নিয়ে দুঃস্বপ্ন দেখেন?

সাদ আল-বিশি :আমি? আরে না, আমার ভালো ঘুম হয়।

প্রশ্ন : আপনাকে কি মানুষ ভয় পায়? এড়িয়ে চলে?

সাদ আল-বিশি : আমাদের দেশে আমাদের একটি সমাজ রয়েছে যে সমাজ আল্লাহ্তালার আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই আমাকে ভয় পাওয়া বা এড়িয়ে চলার কোনো প্রশ্নই আসে না। আমার অনেক আত্মীয় আছে, মসজিদে আমি অনেক বন্ধুর দেখা পাই, অন্যান্যদের মতো আমিও সাধারণ জীবনযাপন করি। আমার পেশা আমার সামাজিক জীবনে হস্তক্ষেপ করে না।

প্রশ্ন : দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির প্রতি আপনার মনোভাব কি?

সাদ আল-বিশি : শিরশ্ছেদের আগে আমার ইচ্ছে হয়, যদি অপরাধীর বাড়িতে গিয়ে অপরাধীর পক্ষ থেকে ক্ষমা চাইতে পারতাম। শিরশ্ছেদের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমি এই ইচ্ছে লালন করি । আর সব সময় আল্লাহর কাছে অপরাধীর হয়ে ক্ষমা চাই, তিনি যেন তাকে ক্ষমা করেন।

প্রশ্ন : একটি শিরশ্ছেদের জন্য সৌদি সরকার আপনাকে কত দেয়?

সাদ আল-বিশি : এটা বলা যাবে না। এটি সৌদি সরকার এবং আমার মধ্যকার একটি গোপন চুক্তি। আর পুরস্কারটা বড় ব্যাপার নয়, আমি গর্বিত আমি আল্লাহর আইনকে বাস্তবায়নে কাজ করতে পারছি।

প্রশ্ন : আপনার তলোয়ারটি সম্পর্কে কিছু বলুন?

সাদ আল-বিশি : শিরশ্ছেদের জন্য ব্যবহৃত একটি তলোয়ারের দাম ২০ হাজার রিয়েল। আমাদের অবশ্য তা কিনতে হয় না, সরকারের তরফ থেকে এটি আমাদেরকে উপহার দেয়া হয়। আমি তলোয়ারটির হেফাজতকারী, তার ধার ঠিক আছে কিনা দেখি এবং লক্ষ্য রাখি তাতে যেন রক্তের দাগ না থাকে। তলোয়ারটি খুবই ধারালো, মানুষ বিস্ময় প্রকাশ করে- এক কোপে কিভাবে গর্দান মাটিয়ে লুটিয়ে পড়ে!

প্রশ্ন : শিরশ্ছেদ করতে গিয়ে অপরাধীর বাধার মুখে পড়েন না?

সাদ আল-বিশি : না। কারণ যখন তাদের আনা হয় ততক্ষণে তারা মৃত্যুর কাছে আত্মসমর্পণ করে দেয়। তবে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তারা ক্ষমা পাওয়ার আশায় থাকে। তাদের যখন আনা হয় তারা মানসিকভাবে খুবই দুর্বল থাকে। আমি তখন দন্ডাদেশ পড়া শেষে এক কোপে বন্দির মাথাটা ফেলে দিই।

প্রশ্ন : তাদের সঙ্গে কথা বার্তা হয়?

সাদ আল-বিশি : একবার কথা হয়, অল্পক্ষণের জন্য। আমরা যখন তাদেরকে কলেমা শাহাদাত পড়তে বলি; ওই একবারই কথা হয়।

প্রশ্ন : নারীদের মৃত্যুদন্ড দিতে কোনো সংকোচ বোধ করেন?

সাদ আল-বিশি : আমি অসংখ্য নারী বন্দির শিরশ্ছেদ করেছি। কোনো সংকোচ বা দ্বন্দ্ব আমার মধ্যে কাজ করেনি। যখন আল্লাহর ইচ্ছেকে বাস্তবায়ন করতে যাই তখন সংকোচ থাকার কথা নয়। আর শিরশ্ছেদের ক্ষেত্রে নারী বা পুরুষের মধ্যে তেমন পার্থক্য নেই। পার্থক্য শুধু এই যে, নারীরা হিজাব পরে। নারী বন্দির শিরশ্ছেদের সময় জল্লাদ ছাড়া আর কাউকে কাছাকাছি ভিড়তে দেয়া হয় না। নারীদের ক্ষেত্রে অনেক সময় বন্দুক ব্যবহার করা হয়। তলোয়ার বা বন্দুক নারী বন্দি যেকোনো একটি বেছে নিতে পারে। বেশিরভাগ নারী বন্দিকে তলোয়ার বেছে নিতে দেখেছি।

প্রশ্ন : আপনি কি আপনার সন্তানদেরও এ পেশায় দেখাতে চান?

সাদ আল-বিশি : হ্যাঁ। জল্লাদ হিসেবে আমি আমার বাইশ বছরের ছেলে মাসায়েদকে প্রশিক্ষিত করতে সফল হয়েছি। সেও জল্লাদ হিসেবে উত্তীর্ণ হয়েছে।

প্রশ্ন : প্রশিক্ষণে কোন বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়?

সাদ আল-বিশি : তলোয়ার কিভাবে ধরতে হয় এবং কিভাবে কোপ মারতে হয়- এ দুটি বিষয় খুবই গুরত্বপূর্ণ। একজন দক্ষ জল্লাদ কিভাবে কাজ করেন তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার কোনো বিকল্প নেই।

প্রশ্ন : সৌদি জল্লাদরা কি শুধু মৃত্যুদন্ড কার্যকর করেন?

সাদ আল-বিশি : না না, আমরা শুধু মৃত্যুদন্ড কার্যকর করি তা নয়। আমরা অপরাধীর হাত কিংবা পা কাটি। আমি একটি ধারালো ছুরিও ব্যবহার করি। যখন আমার ওপর কারো হাত কাটার দায়িত্ব পড়ে তখন আমি সংযোগস্থল থেকে তা কেটে ফেলি। আর পায়ের ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে নির্দেশনা থাকে। কতটুকু কাটা হবে তা বলে দেয়া হয়, আমি সে অনুযায়ী কাজ করি।

প্রশ্ন : আপনার দাম্পত্য জীবন সম্পর্কে জানতে চাই…

সাদ আল-বিশি : আমি একজন পরিবারমুখী মানুষ। জল্লাদ পেশায় আসার আগেই আমি বিয়ে করি। জল্লাদ পেশার প্রতি আমার স্ত্রীর কোনো আপত্তি ছিল না। সে শুধু বলেছিল, যেন ভালোভাবে ভেবে-চিন্তে এই পেশা গ্রহণ করি। আমার স্ত্রী আমাকে ভয় পায় বলে আমি মনে করি না। আমার পরিবার আমাকে ভালোবাসে। আমি যখন শিরশ্ছেদ শেষে বাড়ি ফিরি তখনও কেউ ভয় পায় না, বরং আমার তলোয়ারে লেগে থাকা রক্ত ধুতে সাহায্য করে। আমি সাত সন্তানের জনক। আমি নানা হয়েছি। আমার মেয়ের ঘরে একটি ছেলে আছে, তার নাম হাজা। হাজা আমার গর্ব ও আনন্দ। আমার বড় ছেলের নাম সাদ, তারপর মাসায়েদ। আমার পর মাসায়েদই তার পারিবারিক পেশাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.